নকশালবাড়ির মূল্যবান অবদানগুলি হলো।

১) এই প্রথম ভারতের কমিউনিষ্ট আন্দোলনে গেঁড়ে থাকা সুবিধাবাদ, দক্ষিনপন্থী সংসদসর্বস্বতার অচলায়তনে জোর ধাক্কা দেওয়া গেল।
২) এই প্রথম ভারত রাষ্ট্রের আধা–
সামন্ততান্ত্রিক, আধা–ঔপনিবেশিক চরিত্রকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হলো। দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধের পথ ভারতীয় বিপ্লবের পথ হিসেবে সামনে এলো। ভারতীয় বিপ্লবের শত্রু–মিত্রকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করে বিপ্লবের রণনীতি ও রণকৌশল স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হলো। সশস্ত্র বিপ্লব, গণফৌজ, ঘাঁটি এলাকা গড়ার প্রয়োজনীয়তার প্রশ্নটা দৃঢ়ভাবে সামনে আনা হলো। নয়া–গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে ভারতীয় বিপ্লবের স্তর হিসাবে ঘোষণা করা হলো।
৩) মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াদের উৎস ও বিকাশ যে সম্পূর্ণভাবে সাম্রাজ্যবাদের উপর নির্ভরশীল তা চিহ্নিত হলো। ভারতীয় শাসকশ্রেণীর মুৎসুদ্দি চরিত্রকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হলো এবং ভূয়া স্বাধীনতার মুখোশকে উন্মোচিত করা হলো।
৪) নির্বাচন বয়কটের মতো রণকৌশলগত গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্নটাকে সামনে আনা হলো।
৫) সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন করা হলো এবং তাকে ভারতীয় জনগণের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হলো।
৬) আন্তর্জাতিক কমিউনিষ্ট আন্দোলনে চলমান মতাদর্শগত মহা–বিতর্কে, মাওয়ের নেতৃত্বাধীন সংগ্রামের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া হলো এবং মাও সে–তুঙ চিন্তাধারার ব্যাপক প্রচারের কর্মসূচী হাতে নেওয়া হলো।
৭) কাশ্মীর ও নাগা জাতিসত্তা সহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের জাতি ও জাতিসত্তাগুলির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে
(বিছিন্ন হওয়ার অধিকার সহ) সমর্থন জানানোর মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষের কমিউনিষ্ট আন্দোলনে জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে লেনিনীয় নীতিকে এই প্রথম স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করা হলো।
বস্তুত নকশালবাড়িই প্রথম ভারতের কমিউনিষ্ট আন্দোলনকে দক্ষিনপন্থী পঙ্কিল বদ্ধ জলা থেকে মুক্ত করে সঠিক বিপ্লবী দিশায় প্রতিষ্ঠা করল। নকশালবাড়ির এই তাৎপর্যগুলিকে উপলব্ধি না করতে পারলে এই আন্দোলনের প্রভাবে বাংলা কবিতা কিভাবে আলোড়িত হলো তা সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। অনেকেই আছেন নকশালবাড়ির সংগ্রামের তাৎপর্যকে ভালভাবে না বুঝে এই সংগ্রামকে একটা নিছক ব্যর্থ বিদ্রোহ বলে ভাবেন। এর মধ্যে নৈরাজ্যবাদকে হাতরে হাতরে খুঁজে ফেরেন। নকশালবাড়ির ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠা আজকের চলমান জনযুদ্ধ সম্বন্ধেও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গীই পোষণ করেন। উল্টোদিকে, এরাই আবার বাংলা কবিতায় নকশালবাড়ির প্রভাব নিয়ে নানা প্রবন্ধ লেখেন, ভাবখানা এমন যেন নকশালবাড়ির আন্দোলন অন্তর্বস্তুতে নৈরাজ্যবাদ হলেও এর প্রভাবে বাংলা শিল্প–সাহিত্যের ব্যাপক বিপ্লবীকরণ ঘটে গেছে! নকশালবাড়ির রাজনৈতিক অন্তর্বস্তু বাদ দিয়ে এইভাবে নকশালবাড়ির কবিতাকে মহিমান্বিত করার দৃষ্টিভঙ্গী হলো – আদতে নতুন মোড়কে এক ধরনের আঙ্গিকবাদী দৃষ্টিভঙ্গিই। নকশালবাড়ির সংগ্রাম কি আদতে একটা নৈরাজ্যবাদী সংগ্রাম? এর উত্তর জেলের দেয়ালে লিখেছেন নকশালবাড়িরই বিপ্লবী কবি –
ভাঙছি বলেই সাহস রাখি গড়ার
ভাঙছি বলেই সাজিয়ে নিতে পারি
স্বপ্নের পর স্বপ্ন সাজিয়ে তাই
আমরা এখন স্বপ্নের কারবারি।
নকশালবাড়ির প্রভাবে বাংলা কবিতায় বস্তুত ঘটে গেছে অনেক ভাঙচুর, রূপান্তর। নকশালবাড়ির মতাদর্শে সুসজ্জিত কবি প্রথম থেকেই ঘোষণা করেছেন তাঁর শ্রেণী অবস্থান। নকশালবাড়ি আন্দোলনের অন্যতম নেতা,
শহীদ কবি সরোজ দত্ত স্পষ্ট করে ঘোষণা করেন তাঁর শ্রেণী অবস্থান তাঁর ‘ কোনো এক বিপ্লবী কবির মর্মকথা ’ কবিতায় –
গণগগনের পথে অগ্নিরথ জনমানবের
যাহারা টানিয়া আনে তাহাদের সহকর্মী আমি ’
কিংবা শহীদ কবি দ্রোণাচার্য ঘোষ লিখছেন
‘ আমার মুক্তির ডাক ’ কবিতায় –
‘ আমার মুক্তির ডাক আকাশে বাতাসে
শ্রমিকের কৃষকের মাঝে শুধু ভাসে,
আমার স্বপ্নের রঙ লাল –
বয়সের শব্দে শুধু শোষন ছেঁড়ার দিনকাল।
শহীদ কবি মুরারি মুখোপাধ্যায়ের ‘ তুমি কৃষক ’ কবিতায় সরাসরি কৃষক বিদ্রোহের ডাক –
হে কৃষক বিদ্রোহ কর
ঘোরতর বিদ্রোহ
তা ’ না হলে ঘুচিবে না
তোমাদের এই দুর্গ্রহ।
সত্তরের আরেকজন কবি পার্থ বন্দোপাধ্যায় তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করে দেন ‘ আমাকে নির্দেশ দাও ’ কবিতায় –
আমি কোন বসন্তদিনের ফেলে রাখা রাখি ফেরত চাই না আজ
জানতে চাই না ভবিষ্যতের নিশ্চিন্ত নির্ভরতা
শৃঙ্খলিত মানুষের চলার ছন্দের মধ্যে
জেগে উঠেছে যে ঘুম ভাঙার গান
হে সময়, আমাকে তুমি তার প্রতি অনুগত থাকতে সাহায্য করো
হাতুরির ঘা মেরে
প্রতিদিন রক্তের ভিতর তোমার অবিরাম নির্দেশ পাঠাও।
মনিভূষণ ভট্টাচার্য লিখছেন –
রাত্রীর দিগন্ত জুড়ে গেয়ে যাবো বিদ্রোহের গান,
পাথর ফাটিয়ে আনবো সশস্ত্র তৃষ্ণার জল
পাথরে জাগাবো মহাপ্রাণ।
নকশালবাড়ির সংগ্রামে প্রভাবিত কবিরা একদিকে যেমন দ্বিধাহীনভাবে তাদের শ্রেণী অবস্থান স্পষ্ট করছিলেন পাশাপাশি তাঁরা সংশোধনবাদ সহ যে কোন সুবিধাবাদী অবস্থানের বিরুদ্ধেও তাদের লেখনিকে ব্যবহার করতে দ্বিধা করেননি। আপাতত নকশালবাড়ি আন্দোলনের সময়কার আরো এক জন আপোষহীন কবি সৃজন সেনের একটা পদ্য উল্লেখ করার লোভ সামলানো যাচ্ছে না। মনে আছে প্রবীন কমিউনিষ্ট নেতা কমঃসুশীল রায়ের কাছে প্রথম পদ্যটা শুনে ছিলাম। সম্প্রতি সৃজনদা ’ র থেকেই পদ্যটা আবার উদ্ধার করা গেলো, যদিও কবি নিজেই পদ্যটার নামকরণ কি করেছিলেন তা মনে করতে না পারায় তথ্যে অসম্পূর্ণতা থেকেই যাচ্ছে। পাঠক বন্ধুরা এর জন্য আমায় ক্ষমা করবেন। পদ্যটা হলো –
এক যে ছিল হাড়ি
মজতো তাতে দিনে রাতে
সংসদীয় তাড়ি।
তাড়ির জন্যে হয়ে হন্যে
মানুষ সারি সারি
কাকার বাড়ি বাবার বাড়ি
পাঠায় তেলের হাড়ি।
.
কাটছিল দিন এমনি করে
কম করে বিশ বছর ধরে
হুট করে কে দিল মেরে ঢিল
ভেঙে দিল হাড়ি
তাড়ির নেশা কাটিয়ে ওঠে
লাল নকশালবাড়ি।
ঠুনকো হাড়ি এক ঢিলেতে
শব্দ করে ভাঙে
সুরসুরিয়ে বেরিয়ে এল
ডজন খানেক ডাঙে।
সংশোধনবাদের নির্দিষ্ট রূপ হিসেবে তখন দুনিয়া জুড়ে সামনে আসছে ক্রুশ্চেভীয় তিনশান্তি–র তত্ত্ব। এই নয়া সংশোধনবাদীরা আনবিক বোমার ‘ জুজু ’ দেখিয়ে সশস্ত্র বিপ্লবের পথকে বাতিল করে দুনিয়াজুড়ে ফেরি করছেন ‘ শান্তিপূর্ণ পথে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের তত্ত্ব। ’ আর একে ব্যঙ্গ করে কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখছেন –
লাল টুকটুক নিশান ছিল
হঠাৎ দেখি শ্বেত কবুতর
উড়ছে ঊর্ধ্বে আরো ঊর্ধ্বে
ভুখা মিছিলের মাথার উপর
বিপ্লব হোক দীর্ঘজীবি
কিন্তু এখন শান্তি শান্তি
প্রেতের মতো ধুঁকছে মিছিল
উড়ছে পায়রা নধরকান্তি। (লাল টুকটুক নিশান ছিল)
কিংবা শহীদ কবি মুরারি মুখোপাধ্যায় লিখলেন –
শান্তি শান্তি ওঁ শান্তি
অপার শান্তি ভাই
বসিরহাটে রক্ত ঝরে
মন্ত্রী তোলে হাই
একদিকে যখন শান্তির তত্ত্ব আওরে জনগণকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা চালাচ্ছে নয়া সংশোধনবাদ, আর সর্বহারার মহান শিক্ষক কমরেড মাওয়ের নেতৃত্বে চলছে এর বিরুদ্ধে মতাদর্শগত সংগ্রাম, তখন নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রভাবে আলোড়িত কবির কবিতায় উঠে আসছে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতি দৃঢ় সমর্থন। কবি তাঁর কবিতায় ন্যায় যুদ্ধ ও অন্যায় যুদ্ধের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা টানছেন।
‘ শ্রমিকের রাজনীতি’ কবিতায় সৃজন সেন লিখলেন –
যার হাতে বন্দুক
তার হাতে ক্ষমতা
এটাই তো পৃথিবীর ইতিহাস
শোষকেরা সেটা জানে
জানে সেটা শোষিতেরা
বিপরীতমুখী দুই বিশ্বাস…
সৃজন সেন আরো লিখলেন ওই একই কবিতায় –
শোষকের রাষ্ট্রের
পক্ষের বন্দুক
শ্রমিকরা চায় হোক স্তব্ধ
সে মহান লক্ষ্যে
শ্রমিকের বন্দুক
সৃষ্টির ডঙ্কার শব্দ।
সশস্ত্র সংগ্রামের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি বিপ্লবীদের মধ্যে চলছে নতুন এক বিতর্ক সেটা হল এক্ষুনি নতুন পার্টি গঠন করা কতটা সঠিক হবে। নকশালবাড়ির ধারায় তখন গড়ে উঠছে আরো বেশ কিছু জায়গায় কৃষক সংগ্রাম। পার্টি গঠনের বিতর্কে সরোজ দত্ত প্রশ্ন তুলেছিলেন – ‘ মশারি খাটাতেই রাত কাটিয়ে দিলি, শুবি কখন? ’ তাঁর এই একটি প্রশ্নে বহু লোকের সেদিন দ্বিধা কেটে গিয়েছিল। কবি দ্রোনাচার্য ঘোষ পেলেন অগ্রজ কবি কমিউনিষ্ট নেতা সরোজ দত্তের সংস্পর্ষ। দৃঢ় সংগঠন গড়ে তোলার স্বপক্ষে তাঁর অভিমত কবিতার আঙ্গিকে প্রকাশিত হলো –
তীক্ষ্ণ বুলেটের মুখে বস্তুত এখন প্রয়োজন
শ্রেণীশত্রু নিধনের কঠিন কঠোর এক দৃঢ় সংগঠন
সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতি কবির দায়বদ্ধতা কোথায় যেন কবিতা আর জনযুদ্ধকে একাকার করে ফেলেছে। কবি নবারুন ভট্টাচার্যের ভাষায় –
সারাটা দেশজুড়ে নতুন একটা মহাকাব্য লেখার চেষ্টা চলছে।
সমাজের কাছে, মানুষের কাছে, দায়বদ্ধ কবি লিখছেন –
লক–আপের পাথর হিম কক্ষে
ময়না তদন্তের হ্যাজাক আলোকে কাঁপিয়ে দিয়ে
হত্যাকারীর পরিচালিত বিদ্যালয়ে
মিথ্যা অশিক্ষার বিদ্যায়তনে
শোষন ও ত্রাসের রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে
সামরিক অসামরিক কর্তৃপক্ষের বুকে
কবিতার প্রতিবাদ ধ্বনিত হোক
বাংলাদেশের কবিরাও লোরকার মতো প্রস্তুত থাকুক
হত্যার শ্বাসরোধের লাশ নিখোঁজ হওয়ার
স্টেনগানের গুলিতে সেলাই হয়ে যাবার জন্য প্রস্তুত থাকুক
তবু কবিতার গ্রামাঞ্চল দিয়ে কবিতার শহরকে
ঘিরে ফেলবার একান্ত দরকার
সশস্ত্র সংগ্রামের স্বপ্ন কবি মনিভূষণ ভট্টাচার্য দেখালেন তার ‘ নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতায়। এ যেন এক স্বপ্ন ভঙ্গের মধ্যে দিয়ে আরেক নতুন স্বপ্ন নির্মানের গল্প। স্বপ্ন যেখানে জীবনকে অতিক্রম করে।
মহান শিক্ষক মাও সেতুঙ বলেছেন – ‘ যদিও মানুষের সমাজজীবনই সাহিত্য ও শিল্পের একমাত্র উৎস এবং বিষয়–বৈচিত্রে অনেক বেশী জীবন্ত ও অনেক বেশী সমৃদ্ধ । তবু জনগণ কিন্তু প্রতিদিনের জীবন নিয়ে তৃপ্ত নয়,
তাই তারা সাহিত্য ও শিল্প চায়। কেন চায়?
চায় এই কারণেই যে যদিও দুইটিই সুন্দর তবু সাহিত্য ও শিল্পে যে জীবনের ছবি প্রতিফলিত হয়ে ওঠে তা উচ্চতর পর্যায়ে অধিকতর আবেগসম্পন্ন ঘণীভূত বৈশিষ্টে পরিপূর্ণ,
আদর্শের নিকটতর বলে তা প্রাত্যাহিক জীবনের তুলনায় অনেক বেশী সার্বজনীন হয়ে ওঠে বা হয়ে ওঠা তার উচিৎ। বিপ্লবী সাহিত্য ও শিল্পকে বাস্তব জীবন থেকে বিভিন্ন চরিত্র সৃষ্টি করতে হবে এবং ইতিহাসকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে জনগণকে সাহায্য করতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়,
একদিকে রয়েছে ক্ষুধার জ্বালা, অবহেলা, ও অত্যাচার আর অন্যদিকে রয়েছে মানুষ কর্তৃক মানুষের শোষন ও নিপীড়ন। এই বাস্তব সত্য সর্বত্র রয়েছে আর মানুষের কাছে তা প্রতিদিনের সাধারণ ঘটনা বলেই মনে হয়। সেই প্রতিদিনের ঘটনাকে নিয়ে লেখক শিল্পীরা তার মধ্যে ফুটিয়ে তোলেন তার মধ্যেকার দ্বন্দ্ব–সংঘাত, ও সংগ্রামকে এবং এমন রচনা সৃষ্টি করেন যা জনগণকে জাগিয়ে দেয়,
তাদের প্রেরণায় উদ্দীপ্ত করে তোলে, ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে তাদের পরিবেশকেই পরিবর্তন করে দিতে উদ্বুদ্ধ করে তোলে। ’ (ইয়েনানে প্রদত্ত ভাষণ থেকে গৃহিত)
মনিভূষণ ভট্টাচার্যের ‘ নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতায় কবি যেন এমনই একটা উদ্বুদ্ধ হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন –
ভারতবর্ষের সমস্ত রেল শ্রমিক একদিন রাইফেল হাতে
সমস্ত জংশনে জমায়েত হবে…
ভবিষ্যতে শ্রমিকের মাইনের জন্য নয়,
বোনাসের জন্য নয়,
ইজ্জতের জন্য –
সমগ্র রাষ্ট্রের মালিক হবার জন্য লড়াই করবে।
রবীন্দ্রনাথের কবিতার কথা মনে পরে যায়। যদিও দুটো কবিতার গল্প আলাদা। পরিপ্রেক্ষিত আলাদা। কিন্তু কোথায় যেন একটা মিল আছে। আসলে কোথায় যেন গিয়ে দুটো কবিতাই বলতে চাইছে, ‘ বিদ্রোহে আছে ধ্রুব অধিকার।’
মনিভূষণের মতো আরো কয়েকজন কবির স্বপ্ন দেখানোর, জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার কবিতা এখানে উল্লেখ করা দরকার। সরোজলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ অস্ত্রের মুখের দিকে অস্ত্রগুলি ’ কবিতায় লিখছেন –
আমাদের ক্ষেতগুলি পরের জিম্মা থেকে নিয়ে আসা হবে
আমাদের ইস্কুল কলেজ কারখানা
পরের জিম্মায় আর রাখতে দেব না।
কবি সব্যসাচী দেব লিখছেন –
একদিন, কোন–একদিন ভারতবর্ষ জেগে উঠবে
জ্যোৎস্নার গভীরে;
দিগন্তে ছড়ানো গ্রাম, মাইল মাইল টানা তরাই এর
বিশাল অরণ্য, পাহাড়তলির শুঁড়িপথ থেকে,
গেরিলারা উঠে আসবে রাইফেলের ট্রিগারে আঙুল রেখে
সাইরেনের শব্দে ছুটে আসা মজুরেরা কারখানার চিমনির মাথায়
দুলিয়ে দেবে লালতারা;…
যাদের বসন্ত ফুরিয়েছে খাদ্যের সারিতে প্রতীক্ষায়,
আঙুরের রসে ভেজানো অফুরন্ত রুটি তাদের জন্য;
বিশাল স্বদেশের বুকে হেঁটে যাবে লালসেনা,
জেলখানার
দরজা ভেঙে বেরিয়ে আসবে সাথীরা, আর
মৃতদের সমাধির উপর ঝরে পড়বে অবিরাম ফুল;
অন্য আরেকটা কবিতায় রবীন্দ্রনাথের কবিতার লাইনকে মনিভূষণ ব্যবহার করছে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষিতে। একটা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের আবহে ‘ গোধূলি গগনে মেঘে ঢেকে ছিল তারা ’ লাইনটিকে কবি মনিভুষণ ভট্টাচার্য একটা অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন। বাস্তবের ধাক্কায় রোম্যান্টিক ভাবালুতাকে কোথায় যেন ভেঙে শোক থেকে জন্ম নিচ্ছে পবিত্র ক্রোধ।
মা ’ র সাথে দেখা করতে বাড়ি এসেছেন আত্মগোপনকারী বিপ্লবী কর্মী গোকুল। মা বলছেন, আর নয় বাছা এবার ফিরে যা। ঠিক তখনই রাষ্ট্রীয় ঘাতক বাহিনী এসে মা ’ র চোখের সামনে খুন করছে ছেলেকে। ঠিক এই জায়গায়ই এসে কবি প্রয়োগ করছেন রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত গানের লাইন,
সম্পূর্ণ অন্য আবহে –
উনুন জ্বলেনি আর, বেড়ার ধারেই ডানপিটের তেজি রক্ত ধারা,
গোধূলি গগনে মেঘে ঢেকেছিল তারা।
কবিতার পিঠে কবিতায় একে একে লিপিবদ্ধ হচ্ছে সত্তরের দশকের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কালো অধ্যায়।
রক্ত শুধু রক্ত, দেখতে দেখতে দুই চোখ অন্ধ হয়ে যায়
শিক্ষক ছাত্রের রক্ত প্রতিটি সিঁড়িতে, ঘরে,
চেয়ারে, চৌকাঠে বারান্দায়!
দরজা ভাঙা, জানলা ভাঙা, ছাদের কার্নিশ ভাঙা;…
… কাউকে ছুঁড়ে দিয়েছে পুলিশ,
রক্ত বমি করে আজ হাসপাতালে এই বাংলার কিশোর গোঙায়!
(উত্তরপাড়া কলেজ হাসপাতাল)
কিংবা মনিভূষণ ভট্টাচার্য লেখেন তাঁর
‘ দেওয়াল লিপি’ কবিতায় –
ওর নাতিকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। ওর কাছে পাওয়া গেছে –
গাঁজা কোকেন চোরাই সোনা এল এস ডি আন্তমহাদেশীয়
ক্ষেপনাস্ত্র হাইড্রোজেন বোমা প্রভৃতি কিছুই নয়,
মাও সেতুং ও চারু বাবুর কয়েকখানা চটি বই!
এ প্রসঙ্গে কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘ ভয় ’ কবিতাটার মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের একটা হিমশীতল দৃশ্য আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে –
ভয় ঢুকেছে পাড়ায়ঃ
বুড়ো জোয়ান ছেলেকে বলে ‘ চুপ’ ।
জোয়ান ছেলে বউকে বলে ‘ চুপ’ ।
মায়ের বুকে শিশু দিয়েছে মুখ –
‘ চুপ একটাও শব্দ না ’ ।
.
ভয় ঢুকেছে ঘরেঃ
হাসতে শব্দ কাঁদতে শব্দ
শিশুকে নিয়ে কি যে করেন মা।
নবারুন ভট্টাচার্যের কবিতায় আবার একই সাথে এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধেই তীব্র ঘৃণা আর জেহাদ –
এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না
এই জল্লাদের উল্লাস মঞ্চ আমার দেশ না
এই বিস্তির্ণ শ্মশান আমার দেশ না
এই রক্ত স্নাত কসাইখানা আমার দেশ না
আমি আমার দেশকে ফিরে কেড়ে নেব
(এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না)
আর কবি বিপুল চক্রবর্তীর কবিতায় প্রতিস্পর্ধা যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিস্পর্ধা দেখানোর ক্ষেত্রে বাংলা কবিতায় এ যেন এক মাইলষ্টোন।
পা থেকে মাথা পর্যন্ত চাবুকের দাগ যেন থাকে
এমন ভাবে মারো
দাগ যেন বসে থাকে বেশ কিছু দিন
এমন ভাবে মারো
এমন ভাবে মারো
তোমার মারের পালা শেষ হলে
আমাকে দেখায় যেন ডোরাকাটা বাঘের মতন
(তোমার মারের পালা শেষ হল)
বিপুল চক্রবর্তী কিংবা নবারুন ভট্টাচার্যের এই কালজয়ী ঘোষণা তো রাষ্ট্র পরিচালিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আজও আমাদের প্রেরণা দেয়। এছাড়াও বিপুলদার আরেকটা কবিতা এখানে উল্লেখ না করলেই নয়। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শান্ত অথচ বলিষ্ট, স্পর্ধিত উচ্চারন –
পা দুটো কেটে বাদ দাও
তবু আমি হাঁটব
আমার পথে
হাত দুটো কেটে
বাদ দাও তবু আমি বাজাব
আমার সুর
চোখ–দুটো উপড়ে ফেলো
তবু আমি দেখব
আমার স্বপ্ন (তবু আমি)
রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের আবহেই স্বাভাবিকভাবেই চলে আসবে পুলিশী নির্যাতন, জেলখানা,
ভূয়াসংঘর্ষে হত্যার ঘটনাগুলি একে একে। সত্তরের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কালো–অধ্যায়তো আজ সুবিদিত। কর্পোরেট মিডিয়া যতই তাকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুক না কেন এ কলঙ্ক যে মোছার নয়। আর এই ঘটনাগুলোর থেকে উদ্ভূত ক্ষোভ–ঘৃণা–ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ যে বাংলা কবিতায় প্রতিফলিত হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলা কবিতায় তাই আমরা দেখি জেলে–থানা গারদে নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিপ্লবীদের সংগ্রামের কথা, জেলসংগ্রামের কথা,
শহীদদের নিয়ে কবিতা, শহীদ কবিদের নিয়ে কবিতার কথা।
নকশালবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা চারু মজুমদার লিখেছিলেন – ‘ কমরেড রক্ত ঝরা পথই তো একমাত্র বিপ্লবের পথ। মানুষের মুক্তির জন্য মূল্য দেব না, এ তো হতে পারে না। আমাদের উপর প্রত্যেকটি আঘাতই বেদনাদায়ক এবং বেদনা থেকেই জন্ম নেয় মহত্তর ত্যাগের দৃঢ়তা এবং শত্রুর প্রতি তীব্র ঘৃণা – এ দুটো জিনিষ যখন চেয়ারম্যানের চিন্তাধারার সঙ্গে যুক্ত হয় তখনই সৃষ্টি হয় নতুন মানুষ – যে মানুষের জন্মের দিকে তাকিয়ে আছে সারা ভারতের অত্যাচারিত নিপীড়িত মানুষ, দেশের কোটি কোটি দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষক। এই দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষক যেদিন জন্ম দেবে সেই নতুন মানুষকে তাদের নিজেদের মধ্যে, সেদিন সমস্ত চোখের জল মুছে সারা ভারতবর্ষের মানুষ হেসে উঠবে; সে কী প্রবল প্রাণ বন্যা বয়ে যাবে সারা ভারতবর্ষে, উজ্জ্বল তারার মতো জ্বলে উঠবে আমাদের দেশ – সারা পৃথিবীকে করবে আলোকিত। সেই আমাদের স্বপ্নের ভারতবর্ষ বাস্তব রূপ পাবে কত মানুষের আত্মদানের মধ্যে দিয়ে। এই প্রত্যেকটি মৃত্যু যে পাহাড়ের মতো ভারী, কারণ তারা যে আমাদের থেকে অনেক বড় মানুষ হিসাবে গড়ে উঠে ছিল, তাই তো তাদের মৃত্যু লক্ষ লক্ষ জীবন সৃষ্টি করবে। তাই তো এপথের ধুলো চোখের জলেই ভেজাতে হয়, রক্ত দিয়েই দৃঢ় করতে হয়। ’ এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস আর মুক্তির মহাকাব্য লেখার প্রচেষ্টায় শত শত তরুণ প্রজন্মের আত্মত্যাগের ঘটনাগুলোয় কখনো বাংলা কবিতা রক্তাক্ত হয়েছে, কখনো ক্রোধে ঘৃনায় জ্বলে উঠেছে।কবি মনীশ ঘটক প্রশ্ন তুলছেন তাঁর কবিতায়–মনের ভেতরে অবিশ্রাম রক্তপাত করে কারা?
সৃজন সেনের ‘ থানা গারদ থেকে মাকে ’ কবিতায় আমরা পাই এমনই এক নির্যাতনের রক্তাক্ত প্রেক্ষাপট ।
থানা গারদের অহিংসার প্রেমে ওরা উৎপাটিত করেছে
আমার দুহাতের প্রতিটি নখ,
আঙুলগুলোকে বিষাক্ত করেছে
রাইফেলের কুঁদোয় থেঁতলে থেঁতলে।
পার্থ বন্দোপাধ্যায়ের ‘ এক একজন অনেক মানুষ ’ কবিতায় –
অন্ধকারের মাঠের দিকে যার গুলিখাওয়া শরীর
দুদিন দুরাত্রি খোলা আকাশের নিচে পচেছে
সেই ছেলেটা গান গাইতো – মুক্তির গান
পার্থ বন্দোপাধ্যায়ের আরেকটি কবিতায় চলে এসেছে শহীদ কবি এবং কমিউনিষ্ট বিপ্লবী নেতা সরোজ দত্তের শহীদ হওয়ার প্রসঙ্গও।
পাড়ায় পাড়ায় ওৎ পেতে আছে পুলিশভ্যান আর রংবাজ পাইপগান
আমরা ভুলিনি।
গড়েরমাঠে একজন নির্ভিক সাংবাদিকের লাশ পাওয়া গিয়েছিল
(১৯৭২ শেষ হতে চলেছে)
কবি দ্রোণাচার্য ঘোষকে নিয়ে সনৎ দাশগুপ্ত লিখেছেন কবিতা, ‘ দ্রোণ ফুল ’ –
রক্তমাখা দ্রোণফুল পড়ে আছে ঘাতকের থাবার তলায়
ওই ফুল একদিন ফুটেছিল জ্যোৎস্নায়,কবিতায়
সব্যসাচী দেব লিখলেন –
ময়দানের সবুজের উপর গড়িয়ে আসে
সরোজ দত্তর রক্ত,
পাহাড়ের ঢালে আলোক রেখার মতো কাঁপতে থাকে
সুব্বারাও পাণিগ্রাহীর শেষ কবিতা;…
দুধলি ঘাসের বুকে পড়ে থাকে নিহত প্রবীর;
রক্তের ফোঁটায় অঞ্জলি ভরে নেয় ছিন্নমস্তা জন্মভূমি।
(কবির স্বদেশ)
রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে মোকাবিলা করে তখন জেলের ভিতরে বাইরে সর্বত্র চলছে সংগ্রাম। ১৯৭৫ সালের ১৩ই মে হাওড়া জেলে শহীদ হলেন প্রবীর রায় চৌধুরী। খবর শুনে প্রেসিডেন্সি জেলের সেলের দেয়ালে জনৈক রাজবন্দি লিখলেন –
চুপ করো তোমরা
এখানে ঘুমিয়ে আছে আমার ভাই
বিষন্ন হৃদয়ে মলিন মুখে ডেকোনা ওকে
কারণ, ও নিজেই হাসি।
ফুলে ফুলে দেহ ভরিওনা ওর
ফুলে ফুল বাড়িয়ে
কি লাভ?
পারো যদি,
ওকে সমাধিস্থ করো তোমার হৃদয়ে
শহীদ কবি তিমির বরণ সিংহকে নিয়ে শঙ্খ ঘোষ লিখলেন ‘ তিমির বিষয়ে দু–টুকরো ’ –
ময়দান ভারি হয়ে নামে কুয়াশায়
দিগন্তের দিকে মিলিয়ে যায় রুট মার্চ
তার মাঝখানে পথে পড়ে আছে ও কি কৃষ্ণচূড়া?
নিচু হয়ে বসে হাতে তুলে নিই
তোমার ছিন্ন শির,তিমির
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিপ্লবী কবি আশু মজুমদারকে থানা লক–আপে হত্যার ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। দেখেছিলেন সরোজ দত্ত ’ র হত্যাকাণ্ড নিয়ে নিজের প্রজন্মের অধিকাংশ কবিকে নীরব থাকতে। তিনি কিন্তু তাঁর প্রতিবাদ কবিতার ভাষায় ব্যক্ত করতে দ্বিধা করেননি কখনো। শহীদ কবিদের উদ্দেশ্যে তিনি লিখলেন –
যারা এই শতাব্দীর রক্ত আর ক্লেদ নিয়ে খেলা করে
সেই সব কালের জল্লাদ
তোমাকে পশুর মত বধ করে আহ্লাদিত?
নাকি স্বদেশের নিরাপত্তা চায় কবির হৃদপিন্ড?
তবে শান্তি! কার শান্তি! হাজার কুকুর ঘোরে
দুর্ভিক্ষের নবাবী বাংলায়
গান গায় দরবারী–কানাড়া, লেখে পোষাকী কবিতা
তুমি মৃত! বহুদিন কবিতা লেখনি। বহুদিন
পরিছন্ন পোষাক পরনি; ঘুরেছ উন্মাদ হয়ে
উলঙ্গের, নিরন্নের দেশে – তাই মৃত – তুমি পোষাক ছেড়েছো
তার অপরাধ…
(নিহত কবির উদ্দেশ্যে – বীরান্দ্র চট্টোপাধ্যায়)
এই পোষাক ছাড়ার প্রসঙ্গ উঠলেই মনে পরে যায় আরেকটি কবিতার প্রসঙ্গ। সাতের দশকে একদিকে যখন শতশত স্বপ্নদর্শী নিজের জীবনের বিনিময়ে মুক্তির মহাকাব্য লেখার চেষ্টা করছেন, তখন তথাকথিত প্রগতিশীল অনেক কবিই নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে রেখে পোষাকী কাব্য–চর্চায় ব্যস্ত থেকেছেন। সুনীল–শক্তি–নীরেন চক্রবর্তী–সুভাষ মুখুজ্জে, সবাই এই দলভুক্ত। প্রগতিশীলতার আইনী ঘেরাটোপে বসে তাঁদের এই নিশ্চিন্ত কাব্য চর্চা নিয়ে লেখা হয়েছে বেশ কিছু কবিতা। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এমনই এক কবিতা ‘ উলঙ্গ রাজার ’ কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে নিয়ে –
হেইও হো! হেইও হো!
পোষাক ছাড়া, নীরেন! তুমি,
তুমিও ন্যাংটো!
কিন্তু ঘরে তেমন একটি
আয়না রাখে কে?
(নীরেন, তোমার ন্যাংটো রাজা – বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)
সুভাষ মুখোপাধ্যায় তখন ওপার বাংলার সন্ত্রাস নিয়ে মুখর, অথচ এপার বাংলার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নিয়ে মৌনিবাবা সেজেছেন। কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর এই প্রগতিশীলতার ভন্ডামোর মুখোশকে উন্মোচন করে দিয়ে তাঁকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন এপার বাংলার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কথা।
মানুষের মাংসপিণ্ড লোলুপ নরখাদক
আমাদের আকরমের মায়েদের ভাতের থালায় লাথি মেরে
নিয়ে যায় আকরমকে থানায়; বেয়নেটে–
খুঁচানো ইসমাইল পড়ে থাকে
নির্জন খালের ধারে
(সুভাষ যা দেখেছেন – বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)
কিংবা গোলাম কুদ্দুসকে প্রশ্ন করছেন –
গান্ডীব দিয়েছ ছুঁড়ে? কিন্তু তুমি সাংবাদিক,
লেখ তো কাগজে
প্রত্যহের রোজনামচা। তোমার কলমে তবে কী জন্য জ্বলে না
আজ তুষের আগুন?
(যাদের সঙ্গে তুমি পার্টি কর…)
সত্তরের আরেকজন কবি সরোজলাল বন্দ্যোপাধ্যায় সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার লাইনকেই বেছে নিচ্ছেন তাঁকে উন্মোচন করার জন্য।
প্রজারা সুখী হোক না হোক আজ গণতন্ত্র
বৈষম্য কমুক না কমুক আজ সমাজতন্ত্র
কথা বলা যাক না যাক আজ স্বাধিনতা
ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত
(বসন্ত)
কবিতায় শহীদ কবিরা কিভাবে বারবার এসেছেন তা নিয়ে আলোচনা কিছুটা আমরা করেছি।এবার আসা যাক শহীদদের নিয়ে আরো কিছু কবিতা প্রসঙ্গে। সত্তর সালই হোক, বা আজকের সংগ্রামের প্রেক্ষাপটই হোক শহীদ সাথীদের প্রসঙ্গ কিন্তু কবিতার বিষয়বস্তু হিসাবে উঠে এসেছে বারবার। এবার যে তিনটে কবিতার উল্লেখ করব, তিনটে কবিতারই বিষয়বস্তু ‘ শহীদের মা।’ তন্ময় শিকদার, সব্যসাচী দেব এবং মৃদুল দাশগুপ্ত। তিনজনই সত্তরে দশকের নবীন কবি। সব্যসাচী দেব লিখছেন –
তুই ঘুমো খোকন। তোর কুঁকড়ে যাওয়া
নীল ঠোঁটের পাশ দিয়ে এখন আর
রক্ত গড়িয়ে পড়ছে না পাতা খোলা কম্যুনিষ্ট ইস্তেহারের
উপর; তোর খুবলে আনা চোখের গহ্বরে
শুধু জমাট বেঁধে আছে বিশাল স্বপ্ন;
(শহীদের মা)
এই কবিতায় মা কথা বলছেন শহীদ ছেলের সাথে। আর মৃদুল দাশগুপ্তর কবিতায় শহীদ ছেলে কথা বলছেন তাঁর মা ’ র সাথে –
আমি বাতাসের মতো, ও আমার মিষ্টি মা–
মনি
আছি তোমার দু চোখে আজও কঠিন শীতল
মানো না যে মরে গেছি, বোকা মেয়ে, এখনও মানোনি
তাই জেগে বসে থাকো, ভাবো এলো পলাশের দল
(কোন শহীদের মা–কে)
তন্ময় শিকদার তাঁর কবিতায় আরো নির্দিষ্ট করে শহীদ কবি দ্রোণাচার্য ঘোষের মা ’ র জবানবন্দিতে বলছেন –
এসো শহীদ ছেলেদের এক সময়ের প্রিয় সাথীরা
নিশ্চিত বিজয়ের ধ্বনি শোনার জন্য বহুকাল
বহুকাল জেগে আছি বুকের ভেতর আগলে রেখেছি
তোমাদের জন্য আমার সান্ত্বনা আর যন্ত্রনা
আমার শহীদ ছেলেদের স্বপ্ন –
তোমরা নাও।।
শহীদেরা মারা যান, কিন্তু তাদের স্বপ্ন বেঁচে থাকে। মেহনতী জনতার সংগ্রামে, নিপীড়িত জনতার সংগ্রামে শহীদের স্বপ্ন বেঁচে থাকে। সেই স্বপ্ন নিয়ে লড়াইয়ের ময়দানে সামিল হন প্রজন্মের পর প্রজন্ম। শহীদদের নামের তালিকা দীর্ঘতর হয়। কখনো সেই নামের তালিকায় এসে যুক্ত হন সাগর–কাঞ্চন–
সুকান্ত–অর্নব–লালমোহন–সিদো–শশধর। কখনো সেই নামের তালিকায় এসে যুক্ত হন পঞ্চমী–পূরবী–রাগো। বারবার শহীদদের স্মৃতি উস্কে উস্কে ওঠে। আর এই উস্কে ওঠা স্মৃতিগুলো যেন দায়বদ্ধ কবিকে অস্থির করে তোলে। এমনই এক অনুভূতি নিয়ে আশির দশকের শেষের দিকে বিপুল চক্রবর্তী লিখে ফেলেন –
কে বলে তাদের মৃত
ভীষণ ঝড়ের রাতে গাছেরা যখন শন্শন্
হাওয়ায় শ্লোগান তোলে, হাওয়ায় হাওয়ায়
ঝরা পাতারাও কথা বলে
ভীষণ ঝড়ের রাতে
প্রতিটি শহিদ বেদি জেগে ওঠে
ডানা ঝাপটায় ছিঁড়ে যাওয়া পুরনো পোষ্টার
যদিও আরো আগে শহীদদের ফিরে আসার সঙ্কল্পের কথা আমরা পেয়েছি সব্যসাচী দেবের কবিতায় –
ফিরে আসবো, আমরা ফিরে আসবো।
যারা, হারিয়ে গিয়েছিলাম,
কেউ বারাসতের রাস্তায়,
কেউ জেলখানার আড়ালে,
কেউ বরানগরে,দমদমে, বহরমপুরে –
ফিরে আসবো সবাই।
কিংবা মৃদুল দাশগুপ্তের কবিতায় এই ফিরে আসার চিত্রকল্পটাই আমরা দেখতে পাই একটু অন্যভাবে –
ধরো, সেদিনও এমনই রাত,
জালিয়ানওয়ালাবাগে
ডায়ারের বন্দুক নিয়েছে কেড়ে সোনার টুকরো ছেলে
দ্রোণাচার্য ঘোষ!
ভাবো, ভাবো সেদিনের উৎসব! বরানগরের গঙ্গার জল থেকে
আবার এসেছে উঠে
তিনশো তরুণ
(আগামী)
নকশালবাড়ির আন্দোলনের প্রধান দিক হচ্ছে শুরুতেই তা প্রচলিত চিন্তাভাবনার মূলে কুঠারাঘাত করতে সমর্থ হয়েছিল। রামায়ন–
মহাভারত কিংবা প্রাচীন মহাকাব্যের ব্রাহ্মন্যবাদী চিন্তার উপাদানগুলিকে সংশ্লেষণ করে, সম্পূর্ণ নতুন ধরনের ব্যাখ্যা আমরা এই পর্যায়ের সাহিত্যের মধ্যে দেখতে পেলাম। এ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে সবার আগে বলতে হয় সরোজ দত্তের শকুন্তলা কবিতাটির কথা –
দুর্বাসার অভিশাপ, অভিজ্ঞান অঙ্গুরী কাহিনী
স্বর্গ মিলনের দৃশ্য, মিথ্যা কথা হীন প্রবঞ্চনা –
রাজার লালসা যূপে অসংখ্যের এক নারীমেধ
দৈবের চক্রান্ত বলি রাজকবি করেছে রটনা।
কিংবা ‘ উত্তর কাণ্ড’ কবিতায় সরোজ দত্ত নিয়ে এসেছেন শুদ্র শম্বুককে হত্যার কথা। বেদ পাঠের ‘ অপরাধে’ ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে ‘ মহামহিম’ রাম যে তাঁর রাজধর্ম পালন করেছিলেন তাঁর কথা, কিংবা ‘ বীরপুরুষ ’ রামচন্দ্রের অন্যায়ভাবে বালি বধের প্রসঙ্গও।
রাঘবের রাজসভা জমে ওঠে, শুধু মাঝে মাঝে
গলিত মাংসের গন্ধে মরে যায় চন্দন সুবাস –
যমুনার শীর্ণ স্রোতে কোথা হতে এসেছে ভাসিয়া
রাজার স্নানের ঘাটে ছিন্নশির চন্ডালের লাশ।
অন্ধকার গৃহকোনে দন্তহীন স্খলিত চোয়ালে
স্মৃতির জাবর কাটে জরায় স্তবির মহাবীর –
চকিতে স্ফটিক স্তম্ভে ছায়া ফেলে দ্রুত সরে যায়
প্রতিহিংসা–তৃষাতুর ছায়া মূর্তি প্রেতাত্মা বালির
বালি বধের প্রসঙ্গ বলায় একটা কথা বলতেই হয় বালি এখানে বস্তুত বানরদের প্রতিনিধি নন। তিনি একজন দ্রাবির রাজা। নিজ স্বার্থে আর্য রাজা রাম তাকে হীন কৌশলে বধ করছেন। একইভাবে আর্য রাজকুমার অর্জুনের থেকে আদিবাসী রাজপুত্র একলব্য যাতে কোনভাবেই বড় ধনুর্ধর না হয়ে ওঠেন তাই তাঁর সরলতার সুযোগ নিয়ে আর্য ব্রাহ্মন দ্রোণাচার্য তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুল গুরু দক্ষিণা নিয়ে নিচ্ছেন। আজ যখন আদিবাসীদের একটা বড় অংশ কমিউনিষ্ট বিপ্লবীদের নেতৃত্বে বিদ্রোহে ফেটে পড়ছে, শত রাষ্ট্রীয়দমনেও তাকে রোখা যাচ্ছে না, তখন সব্যসাচী দেবের কবিতার কয়েকটা পঙ্তি ভীষণভাবেই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে –
এইখানে দাঁড়াও অর্জুন; দ্রোণগুরু এখানে দাঁড়াও;
আমি একলব্য প্রতারিত দিনগুলি ফেরৎ নেব।
(কলকাতা মনে পড়ে)
কিংবা পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন –
মুক্তির ভারতবর্ষে
এবার কোন একলব্য আঙুল কেটে গুরুদক্ষিণা দেবে না
এক হাতে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র
অন্য হাতে
অস্ত্রের চেতনা নিয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে শূদ্রের পৃথিবী (জানুয়ারি,৭৪)
গবেষকদের থেকে যতটুকু জানা যায়,
নকশালবাড়ির প্রভাবে অসংখ্য বাংলা কবিতা লেখা হলেও, সে তুলনায় বিপ্লবী আন্দোলনকে ধরে সমকালীন মহিলা কবিদের কবিতা কমই পাওয়া গেছে । তবে একেবারে লেখা হয়নি এমনটা নয়।
১৯৭২ সালের ২রা অক্টোবর আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে শহীদ হন কমঃ মানিক দাশ গুপ্ত(সঞ্জয়)। বিপ্লবী আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকার কারণে কবি জয়া মিত্র তখন প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দি। ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় তিনি একটি কবিতা লিখেছিলেন –
দেশের আমার বুকে পাথর, মাথার পাথর পায়।
দৈত্য–দানব পিষছে গলা রক্ত শুষে মারছে গায়ে
বুকের মানিক নিচ্ছে কেড়ে রাখছে আঁধার পাতালপুরে
সাথীর ব্যথা মায়ের কান্না উঠছে যে তাই আকাশ জুড়ে…
মায়ের মানিক ভাইটি আমার তোমার আলোয় দেখতে পাব
ব্যথায় ছেঁড়া হৃদয়–খানা হাতের মুঠোয় ধরে
কারার প্রাচীর তুচ্ছ করে তোমার সাথেই আমরা যাব।
আরো একজন কবি মধুমিতা মজুমদার লিখেছেন –
ওরা কিন্তু এবার জীবনের মানে
খুঁজে পেয়েছে। মুক্তির আস্বাদ
পেয়েছে হাতিয়ার তুলে ধরে।
তোমাদের পা দুটোকে পুড়িয়ে দেবে;
ওদের চোখের আগুন
ওরা বুঝেছে কান্না নিয়ে বাঁচা
যায় না। তাই, ওরা আর কাঁদে না।
(ওরা আর কাঁদে না)
কল্যানী সেনগুপ্তর কবিতায় যেন উঠে এসেছে এক আত্মজিজ্ঞাসা –
দরজাটা খোলা
ভিতরে সূর্যের উত্তাপ
উঁকি মেরে দেখতো
সেই উত্তাপে যার দেহ পোড়ে
সে আমার দেহ কিনা।
(ভাস্বর হৃদয়ে)
নকশালবাড়ির আন্দোলনের প্রভাবে আলোড়িত কবিতায় বিষয়বস্তু হিসাবে প্রেমকে উপেক্ষিত করা হয়েছে, এরকম একটা অভিযোগ প্রায়শই শোনা যায়। এ অভিযোগ সত্যি নয়। আসলে বিপ্লবী সংগ্রাম প্রতিটি বিষয়বস্তুর মতো প্রেম সম্পর্কেও দৃষ্টিভঙ্গীর ক্ষেত্রে ঘটিয়েছে বৈপ্লবিক রূপান্তর। স্বতন্ত্রবাদীদের মতো, প্রেম আর তাই বিপ্লবী কবির কাছে অপূর্ণকাম অক্ষমের মর্ম ব্যাভিচার নয়। বরং দেশের প্রতি ভালবাসা,
জনগণের প্রতি ভালবাসা আর নারী–পুরুষের মধ্যেকার ভালবাসা মিলেমিশে কোথায় যেন একাকার হয়ে গেছে। রোম্যান্টিক না হলে তো বিপ্লবী হওয়া যায় না। যিনি নিজেই স্বপ্ন দেখতে পারেন না তিনি অপরকে স্বপ্ন দেখাবেন কি করে? একজন বিপ্লবী তো অনেক প্রসারিতভাবে স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্ন দেখান। তাই তো আমরা দেখি বিপ্লবী কবি ঘোষণা করেন –
বিপ্লব এ দেশে প্রতিটি প্রেমিক প্রেমিকাকে মুক্তি দেব
(প্রিয়তমাসু – সৃজন সেন)
সত্তরের কবি মৃদুল দাশগুপ্তর পরবর্ত্তীকালে প্রকাশিত ‘ প্রেমের কবিতা’ য় কবি লিখছেন –
ধরো একদিন গেরিলা বাহিনী গড়ে
লুন্ঠনে যাব প্রাসাদ বাগিচা শ্রেষ্ঠির
গুলি বন্দুক খুইয়ে যখন সম্বল শুধু শেষ তীর
ধোঁয়ার ভেতর দেখা হয়ে যাবে সজল করুণ মুখটি
স্তম্ভিত তুমি, ক্রমে বিহ্বলা, দ্বিধাতুর তবু প্রস্তুত
ধরা পড়ে যাবো এই কারণেই, ফাঁসি হয়ে যাবে ভোরে
গাছে শুধু সেদিন ঝুলবে নয়া সামরিক চুক্তি
তুমিও মরবে, আমাদের কথা ভুলে যাবে এই দেশটি
এধরনের ক ’ টা রোম্যান্টিক কবিতা লিখছেন তথাকথিত স্বতন্ত্রবাদি কবিরা? এখানে বিপ্লবী কবির প্রেমিকার কাছে তাঁর প্রেমিকের বিপ্লবী আইডেনটিটি আগে জানা থাকছে না ফলত হঠাৎ তা জানতে পারায় প্রেমিকাটি স্তম্ভিত,
দ্বিধাতুর, বিহ্বলা। সৃজন সেনের কবিতায় প্রেমিকার দ্বিধামুক্তি ঘটাতে কবি বলছেন –
আর যদি শোনো –
শত্রুর উদ্ধত বেয়নেটের সামনে দাঁড়িয়ে
আত্মসমর্পণ না করার অপরাধে একটি সীসার গোলক
একঝলক্ রক্ত ঢেলে কাউকে বিদ্ধ করেছে
তবে মনে মনে বোল – একদিন তাকে তুমি ভালবেসে ছিলে!
(প্রিয়তমাসু)
কবি–গায়ক–গীতিকার বিপুল চক্রবর্তীর কবিতায় প্রেমিকার সাথে একসাথে প্রতিবাদ–
সংগ্রামের দিনগুলিকে ভাগ করে নেওয়ার মুহূর্তগুলিকে মনে করিয়ে দেয়। তাই বিপুল চক্রবর্তীর কবিতায় প্রেম আর সংগ্রামকে আমরা হাতে হাত দিয়ে চলতে দেখি –
হারমোনিয়াম বুঝবে না, বুঝতে পারে না
তালে তালে বেজে যাওয়া
নাল, তাম্বুরিন
তুমিই বুঝবে শুধু
কেন গাইতে গাইতে কেঁপে ওঠে হঠাৎ কন্ঠস্বর
কেন ঠিকরে বেরিয়ে আসে চোখ
কেন শরীর ফুঁসতে থাকে বর্ষার ফুলে ওঠা নদীর মতন
তুমিই বুঝবে শুধু
যে তুমি আমার পাশে, একসাথে
মুক্তপক্ষ মেঘেদের চলাফেরা দুই চোখে নিয়ে
নতুন দিনের গান গাও
(তুমিই বুঝবে শুধু)
সব্যসাচী দেবের কবিতায় আমরা একটু অন্যরকম রোম্যান্টিক ভাবালুতাকে খুঁজে পাই

তারপর পৃথিবীতে নতুন প্রাণের উত্তাপ;
আকাশগঙ্গার স্রোত প্রতিটি হৃদয়ে,
বৃষ্টি শেষে আকাশে চীনাংশুক দোলায় রামধনুঃ
হাতে হাত ছুঁয়ে অসংখ্য মানুষ রচনা করে
নতুন কবিতা
(অমল রোদ্দু)
তিন.
নকশালবাড়ির মৃত্যু নেই। তাই আমরা দেখি সত্তরের দশকের শত দমন পীড়নের মধ্যে দিয়ে যে আন্দোলন প্রাথমিকভাবে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়ে পড়েছিল, ফিনিক্স পাখির মতোই তা যেন আবার জীবন্ত হয়ে উঠল অন্ধ্রে–বিহারে–দণ্ডকারণ্যে–ঝাড়খণ্ডে–
উড়িষ্যায়–পশ্চিমবঙ্গে। প্রাথমিক বিপর্যয়ের পর বিপ্লবী শিবির মূলত সত্তরের আন্দোলনের মূল্যায়নের প্রশ্নে তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। একটি ধারা অতীতের মূল্যায়ন করতে গিয়ে নকশালবাড়ির বিপ্লবী অন্তর্বস্তুকেই বাতিল করে দিলেন। এবং সরাসরি দক্ষিনপন্থী শিবিরে সামিল হয়ে পড়লেন। আরেকটি ধারা পুরোনো ভুলগুলোকেই আঁকড়ে থাকলেন। বারবার তাদের নেতৃত্বাধীন সংগ্রাম ধাক্কা খেল,
অবশেষে তারা বহুধা বিভক্ত হয়ে দক্ষিনপন্থী পাঁকে নিমজ্জিত হলেন। তৃতীয় ধারাটি ছিল প্রকৃত বিপ্লবী ধারা, যারা দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদকে কম্যান্ডে রেখে অতীতের সংগ্রামের মূল্যায়ন করলেন। যুগের প্রশ্নে; খতমকে শ্রেণীসংগ্রামের একমাত্র লাইন হিসাবে দেখার প্রশ্নে; গণআন্দোলনকে বয়কটের প্রশ্নে ভুলগুলোকে তাঁরা চিহ্নিত করলেন। সিপিআই
(এম–এল) (পিপলস্ ওয়ার), সিপিআই
(এম–এল) (পার্টি ইউনিটি) এবং এমসিসি
(আই) হল এই তৃতীয় ধারার উত্তরাধিকারী। দীর্ঘদিন ধরে এই তিনটি প্রকৃত বিপ্লবী ধারা ঐক্যের জন্য উদ্যোগ চালাচ্ছিলেন। ১৯৯৮ সালে প্রথমে পিপলস্ ওয়ার এবং পার্টি ইউনিটির ঐক্য সংঘটিত হয়।পরবর্ত্তীতে ঐক্যবদ্ধ সিপিআই(এম–এল) পিপলস্ ওয়ার এবং এমসিসি (আই) এর ঐক্যের মধ্যে দিয়ে ২০০৪সালের ২১শে সেপ্টেম্বর জন্ম নেয় সিপিআই (মাওবাদী)। আজকে সিপিআই
(মাওবাদী)-র নেতৃত্বাধীন সংগ্রাম ভারতের প্রতিক্রিয়াশীল শাসক শ্রেণীর রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। ইতিমধ্যেই তাঁরা এই সংগ্রামকে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার পক্ষে সবচেয়ে বিপদ বলে চিহ্নিত করেছেন। আজকের এই চলমান সংগ্রামের পেছনেও কবি–সাহিত্যিক–সাংস্কৃতিক কর্মীর অবদান অপরিসীম। বিশেষত তেলেগু সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত বিপ্লবী কবি, সাহিত্যিক এবং তাঁদের সংগঠন বিপ্লবী রচয়িতাল সঙ্ঘম এবং জননাট্যমণ্ডলীর ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তেলেগু সাহিত্যে নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রভাব এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে তা নিয়ে এত অল্প পরিসরে আলোচনা করা সম্ভব নয়। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহলের গড়ে ওঠা বিপ্লবী সংগ্রামকে নিয়েও ইতিমধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য কবিতা, যা দেখে কবি নবারুন ভট্টাচার্যর কবিতার লাইন উদ্ধৃত করে আমরা বলতেই পারি –

Comments

Popular posts from this blog

অভিজ্ঞতাবাদ

সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের মধ্যে পার্থক্য কি?

BSU প্রকাশনা সমূহের নাম