সমাজতন্ত্র কী?

এক কথায় বললে, সর্বহারাশ্রেণীর ক্ষমতাধীন সমাজই সমাজতান্ত্রিক সমাজ – যেখানে পুঁজিবাদকে সমূলে উৎখাত করা হয়েছে। সর্বহারাশ্রেণী কর্তৃক রাষ্ট্র–ক্ষমতা দখল;
পুরনো ব্যবস্থাকে চূর্ণ–বিচূর্ণ করে নতুন ব্যবস্থা দ্বারা প্রতিস্থাপন, উৎপাদন–উপায়সমূহের সামাজিকীকরণ এবং রাষ্ট্র ক্রমশ নিজেই নিজেকে শুকিয়ে মারা – এগুলোই সমাজতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য। এরূপ সমাজে ক্ষমতার সাধারণ ও মূল রূপটি হলো সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব। এই ধারণার মূলে রয়েছে ‘রাষ্ট্র’–এর ধারণা; যা কখনোই শ্রেণী–
নিরপেক্ষ নয়।
শ্রেণীবিভক্ত সমাজে সকল ব্যক্তিই কোনো না কোনো শ্রেণীর অন্তর্গত। এরূপ সমাজে শ্রেণীশোষণ, শ্রেণীবৈষম্য, শ্রেণীসংগ্রাম বিদ্যমান রয়েছে। আর শাসন–ক্ষমতার জোরেই বুর্জোয়াশ্রেণী শ্রমিকশ্রেণীসহ অন্যান্য মেহনতি, উৎপাদক শ্রেণীসমূহকে শোষণ করতে পারে। এই শোষণকে উৎখাত করতে হলে সর্বাগ্রে শাসন–ক্ষমতা বা রাষ্ট্র–ক্ষমতা থেকে বুর্জোয়াশ্রেণীকে উৎখাত করতে হবে। আর এই ব্যবস্থা প্রতিস্থাপিত হবে সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্বমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের দ্বারা। এই রাষ্ট্রের মূল কাজ হলো – বুর্জোয়া ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিসমূহকে দমন করা;
উৎপাদন–উপায়ের সামাজিকীরণে ক্রমউত্তরণ। সমাজতান্ত্রিককালই হলো সাম্যবাদে পৌঁছার উৎক্রমণকাল; যেখানে শ্রেণী–শোষণকে পরিপূর্ণরূপে উৎখাত করা সম্ভব – ক্রমান্বয়ে যা পরিণত হবে শোষণহীন সমাজে; যেখানে শ্রেণীর বিলুপ্তি ঘটবে আর তখন শোষকযন্ত্র হিসেবে রাষ্ট্র তার কার্যকারিতা হারাবে; অর্থাৎ রাষ্ট্র ক্রমশ শুকিয়ে বিলীন হয়ে যাবে।
‘ এন্টি ড্যুরিং’ গ্রন্থে কমরেড ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস বলেন, “সর্বহারাশ্রেণী রাষ্ট্র–ক্ষমতা দখল করে এবং সর্বাগ্রেই উৎপাদন–উপায়গুলি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিতে পরিণত করে। কিন্তু তাতে করে সর্বহারাশ্রেণী শ্রেণী হিসেবে সে নিজেই নিজেকে বিলুপ্ত করে, সমস্ত শ্রেণী–বৈষম্য ও শ্রেণী–বৈরিতার বিলুপ্তি ঘটায় এবং রাষ্ট্র হিসেবে রাষ্ট্রেরও বিলোপ সাধন করে। শ্রেণী–
বৈরিতার মধ্যে পরিচালিত হওয়ায়, এতোকাল পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রয়োজন ছিল, অর্থাৎ নির্দিষ্ট শোষকশ্রেণীর একটা সংগঠনের দরকার ছিল – দরকার ছিল ঐ শ্রেণীর উৎপাদনের বাহ্যিক শর্তসমূহ বজায় রাখার জন্যে, আর তাই বিশেষ করে নির্দিষ্ট উৎপাদন পদ্ধতির (দাসত্ব,
ভূমি–দাসত্ব, মজুরি–দাসত্ব) দ্বারা নিপীড়নমূলক অবস্থাধীনে শোষিতশ্রেণীকে জোর করে ধরে রাখার উদ্দেশ্যে। রাষ্ট্র ছিল সমগ্রভাবে সমাজেরই প্রতিনিধি, একটি দৃশ্যমান প্রতিষ্ঠানে তার কেন্দ্রীভবন। কিন্তু তা ছিল শুধু সেই পরিমাণেই ঐ শ্রেণীটির রাষ্ট্র,
যে পরিমাণে সে নিজে, তার স্ব–কালে,
সমগ্রভাবে সমাজের প্রতিনিধিত্ব করতো – প্রাচীনকালে তা ছিল দাস–মালিক নাগরিকদের রাষ্ট্র; মধ্যযুগে সামন্ত অভিজাতদের; আর আমাদেরকালে বুর্জোয়াশ্রেণীর রাষ্ট্র। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র যখন হয়ে উঠবে সমগ্র সমাজেরই প্রতিনিধি, তখন সে নিজেকেই করে তুলবে অনাবশ্যক। দাবিয়ে রাখার মতো কোনো সামাজিক শ্রেণী যখন আর থাকবে না, যখন অপসারিত হয়ে যাবে শ্রেণী–শাসন, আর উৎপাদনের ক্ষেত্রে বর্তমান নৈরাজ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিগত অস্তিত্বের সংগ্রাম, সেই সঙ্গে এই সংগ্রাম থেকে উদ্ভূত সংঘাত ও অমিতাচার; তখন দাবিয়ে রাখার মতো আর কিছু থাকবে না – কোনো আবশ্যকতাই থাকবে না বিশেষ দমনমূলক শক্তির, তথা রাষ্ট্রের। সমাজের পক্ষ থেকে উৎপাদনের উপায়সমূহের অধিকার গ্রহণ – এই যে প্রথম কাজটি দ্বারা রাষ্ট্র প্রকৃতই এগিয়ে আসবে সমগ্র সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে, সেটিই হবে রাষ্ট্র হিসেবে তার শেষ স্বাধীন কাজ। সামাজিক সম্পর্কস্মূহের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ তখন একের পর এক পরিমণ্ডলে অবান্তর হয়ে দাঁড়াবে এবং তারপর আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে। ব্যক্তির শাসন–নিয়ন্ত্রণের জায়গায় আসবে বস্তুর শাসন, আর উৎপাদন–প্রক্রিয়ার পরিচালনা। রাষ্ট্র ‘বিলুপ্ত’ (abolished) হয়ে যাবে না। ‘ক্ষয় হওয়ার মধ্য দিয়ে তা বিলীন’ (It withers away) হয়ে যাবে। ‘স্বাধীন জন–রাষ্ট্র’
(People’s State) কথাটির মূল্যাবধারণ করতে হবে এই দিক থেকেই – উভয়ত প্রচারমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে, কিছু সময়ের জন্যে তার যুক্তিসম্মত ব্যবহারের দিক থেকে,
এবং তার চরম বৈজ্ঞানিক অপ্রতুলতার দিক থেকে, আর নৈরাজ্যবাদীদের তথাকথিত এই দাবির দিক থেকেও যে, রাতারাতি রাষ্ট্রের বিলোপ ঘটাতে হবে।”
মার্ক্সীয় মতানুসারে, শ্রেণীর বিলুপ্তি ঘটার আগে রাষ্ট্রের বিলোপ ঘটে না। সকল পুঁজিবাদী দেশেই শাসন–ক্ষমতা থাকে বুর্জোয়াশ্রেণীর হাতে। সরকারের রূপ যা–ই থাকুক না কেন, তা অপরিবর্তনীয়ভাবে বুর্জোয়াশ্রেণীর একনায়কত্বকে আড়াল করে। বুর্জোয়া রাষ্ট্রের অভীষ্ট হলো – পুঁজিবাদী শোষণকে টিকিয়ে রাখা; কল–কারখানা–
ফ্যাক্টরি ও জমির উপর বুর্জোয়াশ্রেণীর ব্যক্তি ও কর্পোরেশনের মালিকানা রক্ষা করা। সমাজতন্ত্রকে বিজয় অর্জন করতে হলে অবশ্যই বুর্জোয়াশ্রেণীর শাসন উচ্ছেদ করতে হবে এবং তার স্থলে অধিষ্ঠিত করতে হবে সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব। সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্বের অর্থ হলো – ব্যাপক জনগণের স্বার্থে শোষকদের ক্ষুদ্র দলটির ওপর শ্রেণীগত আধিপত্য। রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে সর্বহারাশ্রেণী শাসকশ্রেণীতে পরিণত হয় – সকল সামাজিকীকৃত উৎপাদন পরিচালনা করে, শোষকশ্রেণীর প্রতিরোধ চূর্ণ–বিচূর্ণ করে, সকল নিপীড়িত শ্রেণীগুলোকে নেতৃত্ব দান করে ও মতাদর্শিক পুনর্গঠনে নেতৃত্ব প্রদান করে।
শাসকশ্রেণীতে পরিণত হয়েই সর্বহারাশ্রেণী শ্রেণীহীন সমাজ গড়ার কাজ চালিয়ে যেতে থাকে অর্থনৈতিক ক্রমউত্তরণ ও রাজনৈতিক মতাদর্শিক সংগ্রাম পরিচালনার মাধ্যমে। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সর্বহারাশ্রেণীর বিরামহীন শ্রেণী–সংগ্রামের মাধ্যমে, সর্বহারা বিপ্লব ও সম্পত্তির মালিকানার সামাজিকীকরণের মাধ্যমেই কেবল পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ সম্ভব। পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ সাধন তাৎক্ষণিকভাবেই সম্পন্ন করা যায় না। একটি দীর্ঘ উত্তরণকাল এড়িয়ে যাওয়া যায় না। এই সময়কালে রাষ্ট্র–ক্ষমতা সর্বহারাশ্রেণীর হাতেই থাকে।
কমরেড ভ্লাদিমির লেনিন বলেন, “শ্রেণীসমূহের বিলুপ্তি হচ্ছে একটা দীর্ঘ, কষ্টসাধ্য ও বিরামহীন শ্রেণী–সংগ্রামের ব্যাপার, যা পুঁজির শাসনের উচ্ছেদের পর, বুর্জোয়া রাষ্ট্রের ধ্বংস সাধনের পর, সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার পর তিরোহিত হয়ে যায় না, বরং কেবলমাত্র তার রূপ বদলায়, বহুদিক দিয়েই হয়ে দাঁড়ায় অধিকতর তিক্ত।” (ভিয়েনার শ্রমিকদের প্রতি শুভেচ্ছা)
১৮৭৫ সালে ‘গোথা কর্মসূচীর সমালোচনা’ শীর্ষক গ্রন্থে কমরেড কার্ল মার্ক্স বলেন, “পুঁজিবাদী সমাজ আর কমিউনিস্ট সমাজ;
এই দুইয়ের মাঝে রয়েছে একটি অপরটিতে রূপান্তরের এক পর্ব। তারই সঙ্গে সহগামী থাকে একটি রাজনৈতিক উৎক্রমণ পর্ব
(transitional period), যখন রাষ্ট্র সর্বহারাশ্রেণীর বিপ্লবী একনায়কত্ব ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।”
অর্থাৎ, সমাজতন্ত্র হলো – পুঁজিবাদ উৎখাতের পর থেকে সাম্যবাদে উত্তরণকালীন একটা পর্ব। এ সময়ে সমাজতান্ত্রিক সমাজও পুঁজিবাদে অধঃপতিত হতে পারে; আবার পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ ঘটতে পারে। পৃথিবীতে এ পর্যন্ত সর্বহারা একনায়কত্বের যে সমস্ত অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে রয়েছে, তাতে আমরা ‘সমাজতন্ত্র’ নামক সমাজ–বিচ্ছিন্ন কোনো বস্তুর দেখা পাই না। বরং এমন সমাজ যেখানে পুঁজিবাদের উৎখাত ঘটেছে; সেই সমাজ ক্রমউত্তরণের মধ্যদিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়। সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণকালীন পুরো পর্যায়টিই সমাজতন্ত্রের অন্তর্গত। মার্ক্স থেকে মাও পর্যন্ত কমিউনিজমের মহান শিক্ষকেরা আমাদের এটাই শিখিয়েছেন যে,
এটা এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া; যা দীর্ঘকালব্যাপী চলমান থাকে – পুঁজিবাদ থেকে কমিউনিজমে উৎক্রমণের কাল। পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশে সমাজতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরেই সাম্যবাদের পর্বটির আবির্ভাব ঘটবে। কিন্তু সুপ্রতিষ্ঠিত, অর্থাৎ সমাজতন্ত্রের সবগুলো নীতি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে অনুসৃত না হলেও, যদি সেখানে সমাজতন্ত্রের বিকাশ ক্রমউত্তরণকালীন পর্যায়ে থাকে; তবে তাকে অবশ্যই সমাজতন্ত্র বলতে হবে – সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্বই এক্ষেত্রে মূল মানদণ্ড। আর এজন্যই আমরা বলি, রাশিয়া ও চীনে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অর্থাৎ,
রাশিয়া ও চীন সমাজতন্ত্রের পথে ছিল। রাশিয়া ও চীনের অভিজ্ঞতা বা শিক্ষা মার্ক্স–
এর উপরোক্ত কথার যথার্থতাই প্রমাণ করে – “পুঁজিবাদী সমাজ আর কমিউনিস্ট সমাজ;
এই দুইয়ের মাঝে রয়েছে একটি অপরটিতে রূপান্তরের এক পর্ব” – সেখানে পুঁজিবাদ উৎখাত হয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়; আবার পরবর্তীতে রাশিয়া ও চীন যথাক্রমে স্ট্যালিন ও মাও পরবর্তী সময়ে পুঁজিবাদে অধঃপতিত হয়। এই সমাজগুলো কমিউনিজমের লক্ষ্যে তাদের যাত্রা যতোদিন অব্যাহত রেখেছিল,
যতোদিন তাদের গতি ছিল সামনের দিকে,
যতোদিন পর্যন্ত ‘বুর্জোয়া অধিকার’ এবং সমস্ত বুর্জোয়া অবশেষ ও নব–উদ্ভূত বুর্জোয়া উপাদানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত ছিল;
ততোদিন এই সমাজগুলো সমাজতান্ত্রিক সমাজই ছিল। এই সমাজগুলো অবশ্যই ক্রমাগতভাবে উচ্চতর স্তর, সাম্যবাদে উন্নীত হতো; এবং ভবিষ্যতের সামজতান্ত্রিক সমাজগুলোতেও তা হবে, ক্রমাগত সেগুলো কমিউনিজমের সন্নিকটবর্তী হবে এবং রাষ্ট্র শুকিয়ে মরা শুরু করবে – এগুলো অনিবার্য।
সমাজতন্ত্র আর সাম্যবাদ বা কমিউনিজমের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ‘সাধ্য অনুযায়ী শ্রম ও শ্রম অনুযায়ী ভোগ’ – এটা হলো সমাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য। অপরদিকে, ‘সাধ্য অনুযায়ী কাজ ও প্রয়োজন অনুযায়ী ভোগ’ – এটা হলো সাম্যবাদের বৈশিষ্ট্য। সমাজতন্ত্রে শ্রেণী থাকবে, তাই শ্রেণী–সংগ্রামও থাকবে,
আর তাই রাষ্ট্রও থাকবে, থাকবে সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব। কিন্তু সাম্যবাদে শ্রেণী থাকবে না, তাই শ্রেণী–সংগ্রামও থাকবে না, যেহেতু দমন করার মতো কোন শ্রেণীর অস্তিত্ব থাকবে না, তাই রাষ্ট্রের কার্যকারিতা থাকবে না, আর তাই সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্বও থাকবে না।
এঙ্গেলস বলেন, “সর্বহারাশ্রেণীর কাছে যতোদিন রাষ্ট্রের প্রয়োজন থাকছে, ততোদিন সে প্রয়োজনটা স্বাধীনতার স্বার্থে নয়, নিজ প্রতিপক্ষীয়দের দমনের স্বার্থে এবং যখন স্বাধীনতার কথা বলা সম্ভব হবে, তখন রাষ্ট্র হিসেবে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব আর থাকছে না।”

Comments

Popular posts from this blog

অভিজ্ঞতাবাদ

সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের মধ্যে পার্থক্য কি?

BSU প্রকাশনা সমূহের নাম